এভাবেই একদিন সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার টেবিল ঘিরে তিনজন দাঁড়িয়ে আছে। কাউন্টারে বসা সফেদ দাঁড়িওয়ালা বুড়ো সফিউল্লাহ, ওয়েটার আর অন্য একজন নতুন লোক। লোকটার দিকে তাকিয়ে আমি ভিষণভাবে চমকে উঠলাম!! অবিকল আমার মতো দেখতে! আমি সবিস্ময়ে উঠে দাঁড়ালাম। উনি আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছেন। আমার গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেলো। শীতল কন্ঠে উনি আমাকে বললেন,
-কাজটা ঠিক করলেন না। খাবারটা আমার খাওয়ার কথা ছিলো।
কথাগুলো যেনো অনেক দুর থেকে ভেসে আসছিলো।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। আমার বাম গালে কাটার দাগ ছাড়া এর সাথে আমার চেহারার কোনো পার্থক্য নেই। অবিশ্বাস্য। আমার কেমন যেনো মাথা ঘুরতে লাগলো। লোকটা অবিশ্বাস্য শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার মনে হলো আমার ভেতরের সবকিছু সে চোখ দিয়ে বের করে ফেলছে। আমার নিজের কোন সত্তা যেনো নেই। কোন এক অজানা অস্থিরতা আমাকে গ্রাস করে ফেললো। প্রচন্ড মাথা ঘুরতে লাগলো আমার। সফিউল্লাহ আমাকে তীব্র ভৎসনা করে উনার সাথে একটু সাইডে যেতে বললেন। উনি এবার আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি কোনো কিছু গোপন না করে সবটাই তাকে বললাম। আর আমি তাদের সম্পর্কে যা শুনেছিলাম সেগুলোও বললাম। উনি সব শুনে গম্ভীর হয়ে বললেন,
-আপনার আগেই সব বলা উচিৎ ছিলো। এখন আপনি অনেক বিপদে পড়বেন। আর এই বিপদ থেকে আপনাকে উদ্ধারের উপায় আমার জানা নেই। আপনি যাদের এখানে দেখছেন এরা সবাই আমাদের মতন মানুষ না। এরা জ্বীন।
এবার আমার চোয়াল ঝুলে পড়লো। আমি কাকুতিমিনতি করতে লাগলাম। সফিউল্লাহ আমাকে বললেন, সেই বৃদ্ধ যে বালি ঝড়ের রাতে তার বাবা আব্দুল্লাহর কাছে এসেছিলেন উনি এখনও বেঁচে আছেন আর মাঝে মাঝে আসেন। উনার বয়স কতো তা কেউ জানেনা। উনি খুবই বুজুর্গ জ্বীন, এদের সবার সর্দার। তবে যার খাবার আমি খেয়ে এসেছি এতদিন উনি প্রচন্ডরকম হিংস্র আর বদরাগী। আয়াতুল কুরসি ছাড়া আর কোনোভাবেই এদের কাছ থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। আর কোন দোয়া কালেমায় এদের কিছু হয়না।
সফিউল্লাহর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমার মাথা আবার ঘুরতে লাগলো। চোখে লাল নীল বিভিন্ন কালারের প্যাটার্ন দেখতে লাগলাম। জ্ঞান হারানোর আগে শুনতে পেলাম সাইফুল্লাহ চীৎকার করে আমাকে আয়াতুল কুরসি পড়তে বলছেন আর বলছেন সাবধান ও আপনার ভেতরে প্রবেশ করতে চাচ্ছে। কোনও ভাবেই এটা হতে দেয়া যাবেনা। আমি কিছুতেই আয়াতুল কুরসি মনে করতে পারছিনা। শুনতে পেলাম সাইফুল্লাহ নিজেই অনেক জোরে আয়াতুল কুরসি পড়ছে আর আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে।
জ্ঞান ফেরার পরে দেখি আফিয়া আমার পাশেই চিন্তিত মুখে বসে আছে। ওর মুখে স্বস্তির ছাপ দেখা গেলো। একটু ধাতস্থ হতেই আফিয়া বললো আমি নাকি ঘন্টা দুই আগে কয়েক মিনিয়ের জন্য বাসায় এসেছিলাম! কিন্তু কোনো কথা না বলেই দুই মিনিট পরে আবার বেড়িয়ে গিয়েছিলাম। অজানা আশংকায় আমার বুক কেঁপে উঠলো। বেশ বুঝতে পারছিলাম যে সেটা আমি নই। কিন্তু আফিয়াকে আমি কিছুই বললাম না। সেদিন থেকেই আমার বাসায় বিভিন্নরকম অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে লাগলো। সারাদিনে অসংখ্যবার দরজায় ধাক্কা পড়তে লাগলো। দরজা খুলে কাউকেই পাওয়া যায় না। বাসার সামনে সকাল সন্ধ্যা কুকুরের বিকট ঘেউ ঘেউ সহ নাম না জানা নিশাচরী পাখির ডাকাডাকি। রাতের ঘুম লাটে উঠলো। ঘুমের ঘোরে আমি নাকি অনর্গল আরবিতে কথা বলি! অফিসে আমার কাজে মন নেই। সেদিন আফিয়া দুপুরে আমাকে ফোন দিয়ে বললো, আমি নাকি অফিসের চাবি রেখেই মাত্র বেরিয়ে গেলাম। বিস্ময় গোপন রেখেই আমি তৎক্ষনাৎ অফিস থেকে বের হলাম। রিক্সায় খুব দ্রুতই পৌঁছে গেলাম। আফিয়া দরজা খুলতেই ভূত দেখার মতোন চমকে উঠলো। আমাকে দেখে তার মুখ দিয়ে গো গো শব্দ বের হতে লাগলো! সে উচ্চস্বরে আমার নাম ধরে চীৎকার করে ডাকতেই আমার রুম থেকে আমার কার্বন কপি বের হয়ে এলো। সেই মুহুর্তে আমার আবার প্রচন্ড মাথা ঘুরতে লাগলো। আমি চীৎকার করে আফিয়াকে আমার কাছে আনতে গেলাম কিন্তু সে আরও বেশি আমার রূপধারী জ্বীনটার দিকে এগিয়ে গেলো। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেও আয়াতুল কুরসি মনে করতে প্রলাম না। জ্বীনটা বিড়বিড় করে কি সব পড়ে আমার দিকে ফুঁ দিতেই আমার সর্বাঙ্গ জ্বলতে লাগলো। প্রচন্ড যন্ত্রনায় আমি ছটফট করতে লাগলাম। পুরোটা সময় আমি আফিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু আমার মুখ দিয়ে এক ফোঁটা আওয়াজ বের করার উপায় ছিলো না। প্রচন্ড যন্ত্রণায় আমি যখন প্রাণের আশা ছেড়েই দিলাম তখন একটা ব্যাপার ঘটলো। জানিনা কোথা থেকে সেই বৃদ্ধ সাইফুল্লাহ এসে হাজির হলেন সাথে অপর এক বৃদ্ধ, পাহাড়ের মতন লম্বা আর অস্বাভাবিক কাঠিন্য চেহারায়। উনি এসেই বিজাতীয় ভাষায় আমার রূপধারী জ্বীনের দিকে তাকিয়ে কি সব বললেন। আমার ঘরে যেনো ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেলো। তার পর উনি পানির মতোন কিছু একটা সেই জ্বীনের দিকে ছুঁড়ে দিতেই সে বিকট চিৎকার দিয়ে পড়ে গেলো। আর আমি সবিস্ময়ে দেখলাম সে একটা মস্ত দাঁড় কাকে পরিনত হলো। তার পরে সেই বৃদ্ধ সেটাকে ধরে একটানে মাথা ধর থেকে আলাদা করে ফেললেন। সাথে সাথে আমার মাথাটা কেমন যেনো হালকা হয়ে গেলো আর আমি সবকিছু মনে করতে পারলাম। আয়াতুল কুরসি পড়তে যেতেই বৃদ্ধটি আমাকে নিষেধ করলেন আর উনি চলে গেলে পড়তে বললেন।
আফিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলো। অনেক সেবা যত্নের পরে তার জ্ঞান ফিরে এলেও সে কেমন যেনো অস্বাভাবিক হয়ে গেলো। অল্পতেই ভয় পেয়ে যেতো। কোনকিছু মনে রাখতে পারতোনা। আমি তাকে আগের চেয়েও ভালোবাসতাম কিন্তু সেই প্রানোচ্ছল আফিয়াকে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। সে দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিলো। অনেক চেষ্টা করেও আমি কিছু করতে পারলাম না। কয়েকবছর চিকিৎসা করার পর সে কোনো এক অজানা রোগে মারা যায়। ডাক্তারদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো কারন জানা যায়নি কিন্তু এটা জানা গেছে যে আফিয়ার শরীরের কোষগুলো ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছিলো। তার প্রতিটা অর্গান তার কর্মক্ষমতা হারাচ্ছিলো প্রতিদিন একটু একটু করে।
আমি বেঁচে আছি কিন্তু জীবনের প্রতি আর কোন আকর্ষণ নেই। তেমন কিছুই আর খেতে পারিনা। প্রতিদিন একটু একটু করে দূর্বল হয়ে পড়ছি যেনো। আফিয়া মারা যাওয়ার পরে আর কোনদিন মোরগ পোলাও খেতে পারিনি। চাকুরী ছেড়ে দিয়ে আমি দিল্লি চলে এসেছি কয়েক বছর হয়ে গেছে। সফিউল্লাহ সাহেব মারা গিয়েছেন প্রায় তিন বছর। শহরতলীর সেই হোটেলটাও বন্ধ হয়ে গেছে। আমি দিল্লির সেই হোটেলে মাঝে মাঝে যাই। কিছু খাই না শুধু চুপচাপ বসে থাকি আর অপেক্ষা করি যদি কোনদিন সেই বৃদ্ধ লোকটির সাথে দেখা হয়! তার কাছ থেকে যে এখনও অনেককিছু জানার বাকী!!
সমাপ্ত
© bnbooks.blogspot.com
