সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা আধিভৌতিক গল্প
মধ্য রাতের মোরগ পোলাও
ইশরাক খান
গল্পটি আমার এক ভারতীয় মুসলিম বন্ধুর কাছ থেকে শোনা। ঘটনাটি ঘটেছিলো তার নিজের মামার সাথে। উনি চাকুরীর সুবাদে পাঞ্জাব ছিলেন অনেকটা সময়। আর এই ঘটনাটি ২০০৫ এর কোন এক সময়ের। সেখানেই উনি এই না দেখা ভূবনের সন্ধান পেয়েছিলেন। আসলে সন্ধান পেয়েছিলেন বললে ভুল বলা হবে। জীবন নিজেই তাকে অন্য ভুবনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো। সেই গল্পটাই আজ বলবো।
অফিস থেকে বেরোতে বেরোতেই অনেক রাত হয়ে গেলো। ঘড়ির দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। সর্বনাশ, প্রায় দেড়টা বেজে গেছে। কাঁপা কাঁপা হাতে পকেট থেকে মোবাইটা বের করলাম। যা ভেবেছিলাম তাই! ফোনটা সাইলেন্ট করা। ডায়াল লিস্ট ঘেটে দেখলাম, আফিয়া সর্বমোট ২৮ টা কল দিয়েছে গত দুই ঘন্টায়। কাজের ভেতর এতোটাই ঢুকে গিয়েছিলাম যে ভুলেই গিয়েছিলাম আমার মাত্র এক মাস হয় বিয়ে হয়েছে আর সে এই অচেনা শহরে একা সারাটাদিন আমার অপেক্ষায় বসে থাকে। নিজেকে নিজেই গালি দিলাম। একটু মনে হয় জোরেই হয়ে গেলো। ডান পাশের বন্ধ দোকানের নামানো শাটারের ফাঁক দিয়ে কিছু উৎসাহী মাথা দেখা গেলো। কিন্তু পরক্ষনেই সেগুলো আবার শাটারের ভেতরে ঢুকে গেলো একদম কচ্ছপের মতন। আমি আবার হাটতে শুরু করলাম। প্রচন্ড শীত পড়েছে। আফিয়া বারবার বলা সত্বেও আমি জ্যাকেট না নিয়েই বেড়িয়েছিলাম। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে হাটছি। গলির মাথায় চলে এলাম কিন্তু কোন রিক্সা দেখতে পাচ্ছি না। পাশেই একটা রিক্সার গ্যারেজ কিন্তু সেটাও জনমানবহীন। হঠাৎই খেয়াল হলো দুই দিন ঈদের ছুটি শেষে আজই প্রথম অফিস হোলো। অনেক দোকানপাট এখনো বন্ধ। শহরে অস্থায়ী তরকারিওয়ালা রিক্সাওয়ালা এরা এখনো নিজ পরিবারের সাথে ঈদ করে এখনো ফিরে আসেনি। ওদের সৌভাগ্যের কথা চিন্তা করে আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো নিজের কপাল নিজেই ফাটিয়ে ফেলি। আমার চাকরিটা খারাপ না। বেসরকারী ব্যংকে বেশ মোটা মাইনের চাকরি। কিন্তু দিল্লির বাহিরের ছোট্ট শহরের ব্রাঞ্চ। কাজের চাপ অনেক বেশি। মাঝে মাঝে একেবারে নাভিশ্বাস উঠে যায়। প্রথম দিকে বেশী খারাপ লাগতো তবে পরবর্তীতে আফিয়াকে নিয়ে আসার পরে সেই প্রকট খারাপ লাগাটা অনেক কমে গিয়েছিলো। আর এখন কাজের চাপ ছাড়া অন্য কোন কিছুই আর খারাপ লাগেনা। অফিস থেকে বাসা বিশ মিনিটের রিক্সার পথ। হেঁটে যেতে ঘন্টাখানেক লাগে। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো আমার, তবে কি আজ হেটেই যেতে হবে? বাসায় ঢুকতে পারার যে কিঞ্চিত সম্ভাবনা ছিলো তাও উবে গেলো একেবারে। ফোনটা আবার বেজে উঠলো। আমি হন্তদন্ত হয়ে বের করেই দেখি আফিয়ার ফোন। ভয়ে ভয়ে রিসিভ করতেই ওর শান্ত, শীতল কন্ঠ শুনতে পেলাম।
-তুমি কি আজ আসবে?
-এইতো আসছি। এখনো জেগে আছো? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
-হুম আছি। বাসায় খাবার নেই। তুমি বাইরে থেকে খেয়ে এসো।
বুঝলাম যে খুব রাগ করেছে সে। না হলে রাত দেড়টায় আমাকে বাইরে থেকে খেয়ে আসতে বলতো না।
এদিক ওদিক তাকালাম কিন্তু কোনও দোকানই খোলা পেলাম না। বাম দিকে একটা গলির ভেতর থেকে হালকা কোলাহল শুনলাম। সামনে এগিয়ে যেতেই সুন্দর একটা গন্ধ নাকে এসে লাগলো। কুয়াশা ভেদ করে আরো একটু যেতেই বুঝলাম যে এটা বিরিয়ানির সুবাস। মনটা পুলকিত হয়ে উঠলো। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম। খাবারের গন্ধে পেটের ভেতর ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছে। অবাক হয়ে দেখলাম কি বিশাল দোকান। মানুষে গিজগিজ করছে। সফেদ দাঁড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ কাউন্টারে বসে আছেন। আমাকে দেখেই উনি সহাস্যে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন। আমার খুব অপ্রস্তুত লাগলো। সালামের জবাব দিতে না দিতেই একজন ওয়েটার এসে আমাকে আমার টেবিলে যেতে বললো। আমি ভিষণ অবাক হয়ে গেলাম! আমার টেবিল আবার কোনটা রে বাবা! জীবনে প্রথমবারের মতো এই দোকানে আসলাম। আমি জানতামও না যে এখানটায় এমন বিশাল বিরিয়ানির দোকান আছে! আমার অপ্রস্তুত ভাব দেখে ওয়েটার হেসে বললো,
-অনেকদিন পরে এসে স্যার মনে হয় নিজের টেবিল ভুলে গেছেন?
কাউন্টারে বসা সফেদ দাঁড়িওয়ালা বুড়ো ওয়েটারকে বেজায় ধমক দিয়ে বললেন,
-হারামজাদা বেশী কথা বলতে না করসি না। তোর কাজ উনাদের টেবিলে বসানো। বাড়তি কথা বলতে তোরে বহুতবার না করছি।
আমি আমতা আমতা করে বললাম।
-আপনাদের মনে হয় কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি আজকেই প্রথম আসলাম।
বুড়ো হেসে ফেললেন। বললেন,
-সবাই এমনই বলে হুজুর! তাই আমি এই হারামজাদাদের বলি কাউকেই কোনো কিছু জিজ্ঞেস না করতে। কিন্তু এরা শুধু বেশী কথা বলে।
এবার আমি সর্বোচ্চ অবাক হলাম, হুজুর কেনো বলতেছে আমাকে কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি জিজ্ঞেস করলাম খাবার কি আছে আর দাম কতো।
এবার বুড়োটাও বেশ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো। বললো,
-হুজুর কি খাবারের মেনুটাও ভুলে গেছেন? এসময় শুধু মুরগী বিরিয়ানি করি আমরা। আপনারা তো এটা ছাড়া অন্যকিছু খান না। প্রতি মাসের শেষ সোমবার আমরা তাই মাঝ রাতে এই আয়োজন করি।
কথা শেষ হতে না হতেই ওয়েটার আমাকে একপ্রকার জোর করেই একদম শেষ প্রান্তের টেবিলে নিয়ে গিয়ে বসালো। কাউন্টার থেকে শেষ প্রান্ত অনেকটা হেঁটে যেতে হয়। আমি সবাইকে দেখতে দেখতে যাচ্ছি কিন্তু আশ্চর্য লাগলো যে কেউ একবারও আমার দিকে তাকালো না! কেউ কারো সাথে কোনও কথাও বলছে না। আমি এই এলাকায় নতুন হলেও ব্যাংকে চাকুরী করার সুবাদে প্রায় অনেককেই চেহারায় চিনি। আমার কাছে অনেকেই নানা কাজে আসেন। কিন্তু এই এতো মানুষের কাউকেই আমি চিনতে পারছি না। দেখতে দেখতে আমার খাবার চলে এলো। চমৎকার মোরগ পোলাও! মুখে দিয়েই বুঝলাম অনেক খরচ করে রান্না করা। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে আমি আমার সমগ্র জীবনে এর চেয়ে সুস্বাদু মোরগ পোলাও খাইনি। এ যেনো অন্যরকম স্বর্গীয় স্বাদ। আমার সমগ্র চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। আমি পাগলের মতো খাওয়া শুরু করলাম। প্লেট শেষ হতে না হতেই আরেকটা প্লেট হাজির। আমি দিন দুনিয়া ভুলে গেলাম। আফিয়ার কথা ভুলেই গেলাম। আমার মোবাইলটা ক্রমাগত বেজেই যাচ্ছে। আমি ফোন ধরার সময়টাও নষ্ট করতে রাজী না। পেট ভরে খেলাম।
আমি স্বাভাবিক থাকার খুব চেষ্টা করছিলাম কিন্তু খুব অবাক লাগছিলো। রাত দুটোর সময় তো খোদ দিল্লীতেও কোন বিরিয়ানির দোকান খোলা থাকে বলে আমার জানা নাই। আর এই ছোট্ট শহরে কিভাবে সম্ভব। আমি খাবার শেষ করে উঠে পড়লাম। ওয়েটার গরম পানি এনে আমার হাত ধুয়ে দিলো। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চলতে লাগলাম। কাউন্টারে এসে বিল দিতে চাইতেই বুড়ো হাহাকার করে উঠলেন।
- করেন কি হুজুর। আপনি কেনো বিল দিবেন! ওসব টাকা পয়সা আপনাদের জন্য না।
ততক্ষণে আমার ঘোর লাগা ভাব কেটে গেছে। আমি এবার একটু রেগেই গেলাম। বললাম,
-সেই প্রথম থেকেই আপনি কি সব আবোলতাবোল বলছেন। আমাকে হুজুর বলছেন আবার টাকাও নিতে চাচ্ছেন না।
আমার কথায় বৃদ্ধ লোকটা মনে হয় একটু ভয় পেয়ে গেলো। আবার কেমন যেনো সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে। আমি খেয়াল করলাম এক এক করে সবাই খাওয়া শেষে চলে যাচ্ছে। আশ্চর্যজনক হলেও দেখলাম যে কেউ-ই কোনো টাকা পয়সা দিলো না। আমি আর সময় নষ্ট না করে সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেরিয়ে গেলাম। এভাবে আমি প্রতি মাসেই সেই অতুলনীয় মোরগ পোলাও খেতে সে হোটেলে যেতে লাগলাম। আমার নেশা হয়ে গেলো।
আমার কৌতুহল বেড়েই চললো। এর মাঝে আমি দিনের বেলায় বেশ কয়েকদিন গিয়েও হোটেল বন্ধ পেয়েছি। এলাকার কিছু বয়স্ক মানুষের সাথে কথা বলে জানলাম যে হোটেলটা মাসে একদিন রাতেই খোলে। কারা আসে সেটা কেউ জানেনা। আর এই হোটেলের মেইন ব্রাঞ্চটা দিল্লিতে। খুব চালু ব্যাবসা। লাখ লাখ রুপির বিরিয়ানি বিক্রি হয় প্রতিদিন। রাতের বেলা এই এলাকায় সাধারনত কেউ বের হয় না নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া। প্রচন্ড ঠান্ডা লাগে আর কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকে এলাকাটা। আরও একটা বিষয় শুনলাম, খুব নাকি অশরীরির উৎপাত এই শহরতলীতে। প্রায় আশি বছর আগে আবু আব্দুল্লাহ নামের এই শহরেরই এক ধনাঢ্য ব্যক্তি এই হোটেল করেছিলেন কিন্তু ছয় মাসেও জমাতে পারেননি। এখন যে সফেদ দাঁড়িওয়ালা বুড়োকে কাউন্টারে বসে থাকতে দেখা যায় উনিই আবু আব্দুল্লাহর একমাত্র সন্তান সফিউল্লাহ। কথিত আছে এই পরিবারের সদস্যরা সহজেই জ্বীনদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে পারে। এদের প্রথম পুরুষ ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত একজন পীর। তো এভাবেই বেশ কিছুদিন চলার পর একদিন প্রচন্ড হতাশ হয়ে উনি সব কর্মচারীদের ছুটি দিয়ে দিলেন। মন খারাপ করে অনেক রাত অবধি হোটেল খোলা রেখে বসে আছেন। সাংঘাতিক বালি ঝর উঠেছে এমন সময় এক অতি বৃদ্ধ মানুষ তার হোটেলে এলেন। জীর্ণ শীর্ণ চেহারার মানুষটাকে দেখে খুবই মায়া লগলো আবু আব্দুল্লাহর। লোকটা নিজেই জানালেন যে উনি খুবই ক্ষুধার্ত। আব্দুল্লাহ তাকে যত্নসহকারে ভরপেট আপ্যায়ন করলেন। শুধু মোরগ পোলাও ছিলো। সেটাই বৃদ্ধ চেটে পুটে খেলেন। আব্দুল্লাহ তাকে ভালো মতো দেখেও চিনতে পারলেননা। এই এলাকায় কোনদিন দেখেননি। কি শান্ত সৌম্য চেহারা বৃদ্ধ মানুষটার। খাবার পরে খুব লজ্জিত হয়ে বললেন যে তার কাছে কোনো টাকা পয়সা নেই। যাবার আগে উনি বলে গেলেন তার এই ব্যবসা অনেক বড় হবে। অনেক উন্নতি হবে। পরদিন সকাল থেকেই একের পর এক কাস্টমার আসা শুরু হল। একের পর এক ডেকচি রান্না হচ্ছে আর শেষ হয়ে যাচ্ছে। আব্দুল্লাহ খুব খুশি হয়ে গেলো। নতুন অনেক লোক নেয়া হলো। এর পরেও কাস্টমারের ভীড় সামলাতে হিমসিম খেতে হতো। তার মাস খানেক পরে ঠিক এর আগের মতই প্রচন্ড বৈরি আবহাওয়ার এক রাতে সেই বৃদ্ধ লোকটি আবার এলেন। হোটেল তখন বন্ধ করার প্রস্তুতি চলছিলো। তাকে দেখেই আব্দুল্লাহ দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। সেই বৃদ্ধ আব্দুল্লাহকে দিল্লিতে বেশ বড় আংগিকে হোটেলের মেইন ব্রাঞ্চটা করতে বললেন আর এই শহরতলীর ছোট হোটেলটা প্রতি মাসে শুধু শেষ সোমবার রাত বারোটার পরে খোলা রাখতে বললেন। আব্দুল্লাহ উনার নাম জিজ্ঞেস করতেই কিছু না বলে শুধু হাসলেন! আব্দুল্লাহ উনাকে আর ঘাটালেন না। উনার কথা মতো সব ব্যবস্থা করলেন। ভাগ্য আব্দুল্লাহর উপর সুপ্রসন্ন ছিলো। ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগলো। আর শহরতলীর এই হোটেলটা হয়ে যায় উনাদের জন্য নির্ধারিত।
চলবে.....
(২৭/১২/২০১৯)
© bnbooks.blogspot.com
